TECH GURU, TECH-SCIENCE NEWS

"I celebrate myself, and sing myself,
and what I assume you shall assume,
for every atom belonging to me as good belongs to you."

Friday, August 10, 2012

মঙ্গলগ্রহে মানবযাত্রার আয়োজন (ভিডিও)


1 2

যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণাপ্রতিষ্ঠান নাসার বিজ্ঞানীদের পাঠানো কিউরিওসিটি মঙ্গলের লাল মাটিতে সফলভাবে অবতরণের পর আবারও আলোচনায় এসেছে মঙ্গলগ্রহের অভিযান। এ সফলতা নতুন একটি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে—মঙ্গলে কবে পা রাখছে মানুষ? 
মঙ্গল অভিযান সফল করার লক্ষ্যে গবেষকেরা কঠোর পরিশ্রম শুরু করেছেন। মঙ্গলের পরিবেশে খাপ খাওয়াতে নভোচারীদের কী প্রয়োজন পড়বে, এ নিয়ে অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের সবচেয়ে শীতল অঞ্চলটিতে গবেষণা শুরু করেছেন একদল গবেষক। এদের মধ্যে একজন হচ্ছেন ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির গবেষক আলেকজান্ডার কুমার (২৯)। 
মহাশূন্য অভিযানে মানুষের ওপর মানসিক ও শারীরিক কী ধরনের প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে গবেষণা চলছে অ্যান্টার্কটিকার কনকর্ডিয়া গবেষণাকেন্দ্রে। পৃথিবীর শীতল ও দূরবর্তী অঞ্চল হিসেবে পরিচিত অ্যান্টার্কটিকার প্রতিকূল পরিবেশ। মঙ্গলগ্রহের মতো প্রতিকূল পরিবেশে চরম নিঃসঙ্গ পরিবেশে মানুষের ওপর কেমন প্রভাব পড়তে পারে, তা নিয়ে বিবিসি ফিউচারকে এক সাক্ষাত্কার দিয়েছেন আলেকজান্ডার কুমার।
আলেকজান্ডার কুমার ফ্রেঞ্চ পোলার ইনস্টিটিউট ও ইতালিয়ান অ্যান্টার্কটিক প্রোগ্রামের কনকর্ডিয়া স্টেশনের চিকিত্সক। তিনি ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির গবেষক হিসেবেও এখানে কাজ করছেন। মঙ্গলগ্রহে বাস করতে হলে যে পরিস্থিতিতে নভোচারীদের পড়তে হতে পারে, তা নিয়ে অ্যান্টার্কটিকায় গবেষণা করছেন তিনি। বিশ্বের সবচেয়ে বৈরি আবহাওয়া দক্ষিণ মেরু বা অ্যান্টার্কটিকায়৷ রাশিয়ার ভস্তক স্টেশনের রেকর্ড অনুযায়ী, মহাদেশের কোনো কোনো অঞ্চলের তাপমাত্রা হিমাঙ্কের ৮৯ ডিগ্রি নিচে৷ তাই মহাকাশবিষয়ক বা প্রতিকূল পরিবেশের অভিযানের আগে প্রশিক্ষণে দক্ষিণ মেরুর এ অঞ্চলটিকেই বেছে নেন বিজ্ঞানীরা। যেকোনো দুঃসাহসী অভিযানের আগে এ রকম মহড়া চালান বিজ্ঞানীরা। চাঁদে অভিযানের আগে যেমন মহড়া চালিয়েছিলেন প্রথম চন্দ্র বিজয়ীরা৷১৯৬৯ সালে চাঁদে পা রাখার আগে আইসল্যান্ডের শুষ্ক মাটিতেই প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন নিল আর্মস্ট্রং ও বাজ অলড্রিন৷ কনকর্ডিয়ায় মঙ্গল অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে এক বছরের প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন গবেষকেরা। 
বর্তমানে ‘হোয়াইট মার্স’ বা শ্বেতমঙ্গল হিসেবে পরিচিত অ্যান্টার্কটিকার কেন্দ্রে বাস করছেন আলেকজান্ডার। শীতল, অন্ধকারাচ্ছন্ন ওই স্থানে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রতিকূল পরিবেশ রয়েছে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। আলেকজান্ডার জানান, কনকর্ডিয়ায় তাপমাত্রা হিমাঙ্কের ৮০ ডিগ্রি নিচে নেমে যায়, দিনের বেশির ভাগ সময় বরফে ঢেকে থাকে চারপাশ। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে তিন হাজার ৮০০ মিটার উচ্চতায় শ্বাসকষ্ট হতে থাকে। ফেব্রুয়ারি থেকে নভেম্বর মাসের পুরো সময়জুড়েই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন তাঁরা। এখানে সিলিন্ডার আকৃতির তিনতলা একটি টাওয়ার রয়েছে। 
আলেকজান্ডারের মতে, এটাকে ঠিক বসবাসের উপযোগী বাড়ি বলা যায় না। এটা অনেকটাই মহাকাশযানের মতো। এখানে জীবনধারণের প্রয়োজনীয় উপকরণ হয়তো আছে, কিন্তু চারপাশে শত শত কিলোমিটার এলাকাজুড়ে শুধু বরফ ছাড়া আর কিছু নেই। আলেকজান্ডার এখানে একমাত্র চিকিত্সক হিসেবে কাজ করছেন। তাঁর দলের অন্য ১২ জন সদস্যের শারীরিক চিকিত্সার প্রয়োজনের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য দেখার দায়িত্বও তাঁর। তিনি অ্যান্টার্কটিকার এ পরিবেশে বসে ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার হয়ে মহাকাশযাত্রায় মানুষের স্বাস্থ্য বিষয়ে গবেষণা করছেন। মহাকাশের চরম প্রতিকূল পরিবেশে মানুষ নিঃসঙ্গ হয়ে পড়লে তাঁর মানসিক অবস্থা কেমন হবে, তা নিয়েই কুমারের কাজ। তাঁর এ গবেষণা কবে নাগাদ মানুষ মঙ্গলে যেতে পারবে এবং পৃথিবীতে সুস্থভাবে ফিরে আসতে পারবে, তার জন্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আলেকজান্ডার কুমার বলেন, মঙ্গল অভিযাত্রার জন্য প্রশিক্ষণের কেন্দ্র হিসেবে অ্যান্টার্কটিকাকে বেছে নেওয়ার কারণ হচ্ছে, প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার কৌশল রপ্ত করা। অ্যান্টার্কটিকার পরিবেশ অনেক বেশি প্রতিকূল হওয়া সত্ত্বেও মঙ্গলের সঙ্গে বিস্তর ফারাক রয়েছে। সবচেয়ে বড় পার্থক্য হচ্ছে, মহাকর্ষ বল ও বায়ুমণ্ডলের ঘনত্ব। তবে মঙ্গলের সঙ্গে তাপমাত্রার খুব বেশি ফারাক নেই অ্যান্টার্কটিকার। এই স্টেশনে যাঁরা বাস করার অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন, তাঁরা নিঃসঙ্গ জীবন কাটাচ্ছেন। সভ্য মানুষের জগত্ থেকে বেরিয়ে তাঁদের এ জীবনযাত্রা আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে যে নভোচারীরা বাস করছেন, তাঁদের চেয়েও অনেক কঠিন বলে মনে হয়। নভেম্বর মাসের আগ পর্যন্ত কনকর্ডিয়া বেসে বাস করাটা এক ধরনের অসম্ভব বলেই মনে করছেন তিনি। গবেষণার পাশাপাশি এখানে টিকে থাকার জন্য সদস্যদের নিয়মিত সংগ্রাম করে যেতে হয়। এখানে স্বনির্ভর ও নিজে থেকে টিকে থাকার কৌশল অবলম্বন করতে হয় সদস্যদের। এখানে যে খাবার খেতে হয়, সেগুলো সবই শুকনো ও প্যাকেটজাত। অ্যান্টার্কটিকায় যখন শীতকাল শুরু হয়, তখন খাবারের সরবরাহ ঠিকমতো থাকে না। মঙ্গলে নিঃসঙ্গ জীবন কাটাতে কেমন লাগবে, সে অভিজ্ঞতা লাভে সুযোগ রয়েছে সেখানে। 
আলেকজান্ডারের মতে, এ পরিবেশে টিকে থাকার জন্য অনেক মানসিক শক্তির প্রয়োজন। মানিয়ে নিতে হয় একাকিত্ব, জয় করতে হয় ইন্দ্রিয়কে। এখানে একটা বিষয় সদস্যদের প্রায় পেয়ে বসে আর তা হচ্ছে ‘একঘেয়েমি’। তবে একঘেয়েমি দূর করার জন্য দলের অন্য সদস্যের সঙ্গে সবকিছু ভাগাভাগি করে নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। সাদা বরফের নিস্তব্ধ এ দুনিয়ায় নিজেকে উজ্জীবিত রাখতে হিমশীতল পরিবেশে নিজেকে একাকিত্বের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য উত্সাহ খুঁজতে হয়। অন্ধকার পরিবেশের পর দিনের জন্য অপেক্ষায় থাকতে হয়। আগে এখানে প্রযুক্তির সুবিধা অনেকটাই কম ছিল। কিন্তু এখন প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়ে গেছে। স্যাটেলাইট যোগাযোগ-ব্যবস্থার মাধ্যমে এখন মানসিক নিঃসঙ্গতা থেকে কিছুটা মুক্তি মেলে। এখানে পার্থিব জীবনের অনেক বিষয় স্পর্শ না করায় যেন মনে হয়, নিজের মনের কাছে নিজেই বন্দী। অনেকেই এখানে নিজেকে মৃত বলেই ভেবে বসেন। এ ধরনের মানসিক নিঃসঙ্গতায় পেয়ে বসলেই তখন নিজের শখ ও ইচ্ছাগুলোকে জাগানো প্রয়োজন হয়ে পড়ে। বই পড়া এবং গান শোনার মতো বিষয়গুলো তখন মানসিক প্রশান্তি সৃষ্টি করে। 
আলেকজান্ডার ধারণা করছেন, মঙ্গলের অভিযাত্রীদের ক্ষেত্রেও এ ধরনের মানসিক অবস্থা সৃষ্টি হতে পারে। তবে পৃথিবীতে এ ধরনের অবস্থা সৃষ্টি করায় একটা বিষয়ের ঘাটতি থেকে যায় আর তা হচ্ছে ভরশূন্য পরিবেশ। ভরশূন্য পরিবেশে এ ধরনের পরিস্থিতির পাশাপাশি তাঁকে আরও অনেক শারীরিক সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে। যেমন ফুসফুসের সমস্যা, হাড়ের মজ্জার সমস্যা এবং নিজের ভারসাম্য ঠিক রাখার মতো পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সামর্থ্য অর্জন। মঙ্গলের মাটিতে মহাজাগতিক রশ্মি ও ধুলার ঝড়ে আরও বিপর্যস্ত হয়ে পড়তে পারে নভোচারীর অবস্থা। কিন্তু এ বিষয়গুলো কনকর্ডিয়ায় তেমন প্রভাব ফেলে না। কিন্তু ঘুমের ক্ষেত্রে ব্যাঘাত ঘটে আর সূর্যরশ্মির ঘাটতিতে ভিটামিন ‘ডি’-র অভাব দেখা দেয়। এখানে জীবনযাপনের জন্য দেহঘড়ি ঠিক রাখতে সঠিক কাজগুলো করতে হয়।
‘মার্স ৫০০’ গবেষণার সঙ্গে জড়িত রোমেইন চার্লস নামের একজন গবেষকের উল্লেখ করে আলেকজান্ডার জানান, তিনি ৫২০ দিন নিঃসঙ্গ কাটিয়েছিলেন। তাঁর কাছে মনে হয়েছে, মঙ্গলে মানুষ যদি পাঠানো হয়, তবে তাকে ফেরত আনার নিশ্চয়তা দিতেই হবে। মঙ্গলে গেলে সেখান থেকে ফিরে আসার জন্য একসময় মন চাইবে। ফিরে আসার ক্ষীণ আশাও মঙ্গল অভিযাত্রীদের মানসিক অবস্থা ভালো রাখতে পারবে। কনকর্ডিয়ায় বাস করে আমরাও বহির্বিশ্বের খবর জানতে উত্সুখ থাকি। কারও সঙ্গে যোগাযোগের অপেক্ষায় থাকি। এ ক্ষেত্রে অ্যাপোলো অভিযানের অভিযাত্রীদের একটি তত্ত্ব ছিল, তাহলো কাজে ব্যস্ত থাকা, সময় আর দূরত্বের ব্যাপারটি নিয়ে মোটেও মাথা না ঘামানো। তাঁরা সেটাই করেছিলেন। কনকর্ডিয়ায়ও সেভাবেই সময় কাটে। গবেষণার কাজ, যন্ত্রপাতি ঠিকঠাক রাখা, সবই সময় মেনে করা হয়।
মঙ্গল অভিযাত্রায় কতজন সদস্যকে বেছে নেওয়াটা যুক্তিযুক্ত হবে, সে বিষয়টি নিশ্চিত নন আলেকজান্ডার। তবে বিভিন্ন দেশ থেকে বাছাই করে দক্ষ, মানসিক শক্তি ও প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর সুস্থ নভোচারীকে মঙ্গল যাত্রার জন্য নির্বাচিত করতে হবে বলেই তিনি মনে করেন। তাঁর মতে, এসব নভোচারীকে অবশ্যই মানসিকভাবে সুস্থ ও সবল হতে হবে, নিঃসঙ্গ পরিবেশে কর্মচঞ্চল, উদ্যমী ও উত্সাহী হতে হবে। এখানে নারী-পুরুষ দুই ধরনের নভোচারী থাকা অবশ্যই প্রয়োজন। কনকর্ডিয়ায় বর্তমানে ১৩ সদস্যের মধ্যে মাত্র একজন নারী আছেন। নারীর সংখ্যা কম হলে অনেক সময় ঈর্ষা বেড়ে যেতে পারে। তাই নারী ও পুরুষ মিলিয়ে নভোচারী দল তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে মঙ্গল অভিযানে অবশ্যই দুজন চিকিত্সক পাঠাতে হবে, যাতে চিকিত্সার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা না হয়। 

No comments:

Post a Comment